অসমাপ্ত গল্পের নাম দুলাল টুডু
আমি যেন এক ঘোরের
ভেতর থেকে উত্তর দিলাম, ‘না কাকু, আপনি বলেন। আমার বাবা তো কোনোদিন আমাকে এভাবে
বলেনি। আপনার মুখ থেকে এই কথাগুলো শুনতে আমার অনেক ভালো লাগছে।’
তিনি আমার কথায়
বাধা দিয়ে একরাশ পিতৃস্নেহ নিয়ে বললেন, ‘না না, কালকে তোমার কাজ আছে, ক্লাস আছে। আজ থাক, কালকে আবার বলবো। আমিও ঘুমাতে যাই।’
এই মানুষটি ছিলেন
দুলাল টুডুর বাবা। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের সেই রাতটি স্মৃতির আকাশ থেকে হয়তো
অনেকখানিই মুছে গেছে, কালস্রোতে ভেসে গেছে অনেক
কিছুই। কিন্তু দুলালের বাবার আমাকে নিজের সন্তানের মতো আপন করে নেওয়ার সেই
মুহূর্তটি আজও আমাকে টগবগে এক স্মৃতির আঙিনায় দাঁড় করিয়ে দেয়। আমার ধূসর স্মৃতির
জমিনে এক অদ্ভুত মায়ার প্রথম বীজ বুনেছিল এই পরিবারটি, আর সেই বীজের চারাগাছটি ছিল আমার বন্ধু, আমার ভাই—দুলাল টুডু।
আমাদের দুই
পরিবারের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। আমার বাবা এবং দুলালের বাবা ছিলেন হরিহর
আত্মা—প্রাণের বন্ধু। দিনাজপুরের সেন্ট ফিলিপস স্কুল থেকে তারা একসঙ্গে এসএসসি পাশ
করেন। দুজনেই ছিলেন তুখোড় ফুটবল খেলোয়াড়। একসময় ফুটবলের নেশায় দিনের পর দিন
দিনাজপুরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন তারা। খেলার মাঠের ধুলো
আর ঘামের সাথে মিশে তাদের বন্ধুত্বের শেকড় আরও মজবুত হয়েছিল। আমার বাবা ছিলেন
অখ্রিষ্টান, আর দুলালের বাবা
খ্রিষ্টান। কিন্তু ধর্মের এই ভিন্নতা তাদের আত্মার মিলনে কোনোদিন এক বিন্দু দেয়াল
তুলতে পারেনি।
১৯৯৩ সাল। ডেনিস
মারান্ডির পরম আশ্রয় আর প্রশ্রয়ে আমার ঢাকা শহরে প্রথম পদচারণা। যেহেতু ডেনিস দাদার
সাথে আমার আগে থেকেই হৃদ্যতা ছিল, ঢাকা শহরের অচেনা
ভিড়ে তিনিই ছিলেন আমার প্রথম ভরসা। এরপর আমরা যখন ৭/৩ মনিপুরিপাড়ায় থাকতাম, তখন তারুণ্যের দীপ্তি নিয়ে দুলাল নটরডেম কলেজে
ভর্তি হতে ঢাকায় আসে। সে আমাদের ওখানেই ওঠে।
আমার আজও স্পষ্ট
মনে আছে সেই দিনটির কথা। যেদিন সে এল, আমাকে সে 'হেঁদা দাদা' বলে ডাকল। ডাকার
আগে তার সেই ভুবন ভোলানো একগাল মুচকি হাসি। সান্তালি ভাষায় সে বলল, ‘তুমি তো আমার বাবার বন্ধুর ছেলে। তুমি তো আমার
আপনজন।’
ঢাকায় বসে সেই প্রথম আমি
আবিষ্কার করলাম আমাদের দুই বাবার ফেলে আসা বন্ধুত্বের এক নতুন অধ্যায়। এর আগে
বেনিদুয়ারে তার সাথে দেখা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এমন করে
হৃদয়ের টান অনুভব করিনি। সে সবসময় আমার সাথে সান্তালি ভাষায় কথা বলত, বাংলায় কথা হতো খুব কম। নিজস্ব ভাষায় কথা বলার
সেই মুহূর্তগুলো আমাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল।
সে নটরডেম কলেজে
ভর্তি হলো। আমরা একসঙ্গে থাকি। আমি তখন সাসু (SASU)-এর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মিটিং-মিছিল, দৌড়ঝাঁপ করি।
অবাক করার বিষয় হলো, পড়াশোনার পাহাড়সম চাপ
থাকার পরও দুলাল আমাদের প্রতিটি কার্যক্রমে ছায়ার মতো লেগে থাকত। আমি তখন নতুন করে
এক দুলালকে চিনতে শুরু করলাম। আমি দেখলাম, ছেলেটার বুকে
সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কী তীব্র এক
ভালোবাসা! চারপাশে যখন মানুষ নিজের স্বার্থ নিয়ে অন্ধ, তখন দুলাল ছিল এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। সে
নির্মোহভাবে, নিঃস্বার্থভাবে অন্যের
জন্য কাজ করতে ভালোবাসতো।
সাসু’র
প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের মধ্যে আমি ছিলাম শেষ সভাপতি, আর দুলাল ছিল আমার কমিটির সাধারণ সম্পাদক।
আমাদের পর সাসু’র দায়িত্বভার চলে যায় দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে। দুলাল পরবর্তীতে
সভাপতিও হয়েছিল। তার হাত ধরে সাসু অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল।
এরপর সময়ের নিয়মে
দুলালের বিয়ে হলো। আমারব্যস্ততায় আমাদের মাঝে দূরত্বের একটা পর্দা নেমে আসে।
খুব ঘনিষ্ঠভাবে আর যোগাযোগ হয়ে ওঠেনি দীর্ঘদিন। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে একবার খুব
অল্প সময়ের জন্য দেখা হয়েছিল।
এরপর গত বছরের
(২০২৫) ডিসেম্বর মাস। বাংলাদেশের সান্তাল যুবক-যুবতীদের নিয়ে একটি বৃহৎ সংগঠন গড়ে
তোলার স্বপ্নে আমরা বটমলি টেকনিক্যাল স্কুলে বসেছিলাম। বছরখানেক আগেই আমি তার
অসুস্থতার কথা শুনেছিলাম। সেদিন তাকে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। জিজ্ঞেস
করলাম,
"এখন কেমন আছিস?" সে হাসিমুখে বলল, "চিকিৎসা নিচ্ছি, এখন ভালোই মনে
হচ্ছে।"
নতুন সংগঠনের
নামকরণের প্রস্তাবনার জন্য আমি তাকে অনুরোধ করি। সে অসুস্থ শরীর নিয়েও অনেক কিছু
লিখে পাঠায়। আমার আর তার প্রস্তাবনাগুলো সে নিখুঁতভাবে কম্পাইল করে দেয়। কথা ছিল, এই বছরের (২০২৬) ২১শে ফেব্রুয়ারির দিকে আমরা
আবার বসব। স্বপ্ন বুনব নতুন করে।
কিন্তু নিয়তির
খেলা বড় নিষ্ঠুর। কথা রাখা হলো না তার। সেই সময়গুলোতেই সে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি
হয়। সেখানে টানা ১৪ দিনের মতো ছিল সে। আমি প্রতিদিন ছুটে যেতাম। এক অদ্ভুত মায়া
আমাকে টেনে নিয়ে যেত ওর কাছে। একদিন ওর বিছানার পাশে দাঁড়ালাম। দুলাল আমার দিকে
তাকাল। ওর ক্লান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আমি দেখলাম সেখানে জল চিকচিক করছে। সেই জল
মুহূর্তেই সংক্রামিত হলো আমার চোখেও। আমি নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। গলা দিয়ে
স্বর বের হচ্ছিল না। শুধু কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছিলাম, “সাহস রাখো দুলাল। ডাক্তারদের পরামর্শ শোনো।
বউয়ের সাথে কথা বলে সব সিদ্ধান্ত নিও।”
কথাগুলো বলার পর
আমার গলা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে এল। আমি আর দাঁড়াতে পারছিলাম না। পাশের ডিউটিরত নার্স কে গিয়ে করুণ স্বরে অনুরোধ করলাম, "সিস্টার, প্লিজ আমাকে একটা ছবি তুলতে দেন না। স্মৃতিটুকু
অন্তত ধরে রাখি।" নার্সকে বারবার অনুরোধ করার পরও তিনি নিয়মের কারণে বারণ
করলেন।
আমি কেন সেই দিনগুলোতে বারবার ওর কাছে ছুটে গিয়েছি, আজ ওর চলে যাওয়ার পর তা অক্ষরে অক্ষরে বুঝতে পারছি। অবচেতন মন হয়তো বুঝে গিয়েছিল, ছেলেটা আর বেশিদিন আমাদের মাঝে নেই। সেই কটা দিন আমি রাতে দু’চোখের পাতা এক করতে পারিনি। ঘুমাতে গেলেই বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠত ওর ফুটফুটে ছোট মেয়েটির মুখ। দুলাল ওর বাবার একমাত্র ছেলে। বাবা নেই, মা নেই—একদম কাছের বলতে ওর কেউ ছিল না। কেন এমন হলো? যে মানুষটার বুকে সবার জন্য এত প্রেম, এত ভালোবাসা—তার কেন এমন অকাল বিদায়? মানুষ তো বাঁচতে চায়! বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকার পরও কেন কোষগুলো হঠাৎ করে থেমে যায়?
দীর্ঘ ৩-৪ বছর
মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে এক অসম যুদ্ধ শেষে গত ১০ মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:৫০ মিনিটে ঢাকা আল মানার হাসপাতালে
দুলাল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৭ বছর। এই অকালে
সে তার স্ত্রী এবং আদরের কন্যা সন্তানটিকে রেখে এক অজানা গন্তব্যে পাড়ি
জমালো।
দুলাল টুডু কোনো
সাধারণ ছেলে ছিল না। সে ছিল অসম্ভব মেধাবী। এসএসসি-তে স্টার মার্কস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে অনার্সে
প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ, এবং মাস্টার্সে
প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করা এক রত্ন। এরপর সে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়
নটরডেম কলেজের মতো শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে।
এমন একজন উজ্জ্বল, পরোপকারী এবং মেধাবী সান্তাল তরুণকে অকালে
হারিয়ে সান্তাল সমাজ আজ যে শূন্যতার মুখোমুখি হলো, তা হয়তো কোনোদিন
পূরণ হওয়ার নয়। দুলাল হয়তো আর কোনোদিন সান্তালি ভাষায় আমাকে 'দাদা' বলে ডাকবে না, কিন্তু আমার বাবার বন্ধুত্বের যে প্রদীপ সে
জ্বেলে দিয়ে গেল, তা আমার হৃদয়ের মণিকোঠায়
জ্বলবে চিরকাল।
একটা নতুন পৃথিবীতে আবার দেখা হবে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন