বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬

৫:২৭:০০ PM

দাউরার ডালায় শেকড়ের টান: ধর্মের বেড়াজাল পেরিয়ে ‘সিন্দ্রাদান’ হোক সংস্কৃতির জয়গান

 সান্তাল বিয়েতে ‘সিন্দ্রাদান’ (Sindradan) প্রথা: ধর্মীয় নাকি সংস্কৃতির অংশ? একটি গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ

সান্তাল জনগোষ্ঠী ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং নেপালের অন্যতম বৃহৎ এবং প্রাচীন একটি আদিবাসী সম্প্রদায়। তাদের জীবনযাত্রা, সমাজব্যবস্থা, উৎসব এবং বিবাহ প্রথা মূলধারার সমাজ থেকে বেশ ভিন্ন এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। সান্তাল সমাজে বিবাহকে বলা হয় 'বাপলা' (Bapla)। একটি সান্তাল বিয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয়, গুরুত্বপূর্ণ এবং চূড়ান্ত পর্ব হলো ‘সিন্দ্রাদান’ বা সিঁদুরদান প্রথা।

প্রদত্ত ছবিতে সান্তাল বিয়ের সিন্দ্রাদান পর্বের একটি চমৎকার মুহূর্ত ফুটে উঠেছে, যেখানে কনে একটি বাঁশের ঝুড়িতে (যাকে সাঁওতালি ভাষায় 'দাউরা' বা Daura বলা হয়) বসে আছেন এবং বর একটি পাতা বা বিশেষ উপকরণের সাহায্যে কনের সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিচ্ছেন।

এখন একটি প্রাসঙ্গিক ও গভীর প্রশ্ন হলো— সান্তালদের এই ‘সিন্দ্রাদান’ প্রথাটি কি তাদের ধর্মের অংশ, নাকি এটি নিছকই একটি কালচার বা সংস্কৃতির অংশ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের সান্তালদের ধর্মতত্ত্ব, নৃতাত্ত্বিক পটভূমি এবং সামাজিক কাঠামোর দিকে নজর দিতে হবে।

১. সিন্দ্রাদান প্রথার নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত (Cultural Perspective)


নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, সান্তাল সমাজে সিঁদুরের ব্যবহার মূলধারার হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব (Hinduization বা সংস্কৃতিকরণ)-এর একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়।

  • সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান: প্রাচীনকাল থেকে সান্তালরা প্রকৃতি পূজারি। তাদের মূল বিশ্বাস ব্যবস্থায় সিঁদুরের মতো উপাদানের ব্যবহার আদিম যুগে ছিল কি না, তা নিয়ে নৃতাত্ত্বিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, শত শত বছর ধরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সাথে পাশাপাশি বসবাস করার ফলে হিন্দু বিবাহ রীতির সিঁদুরদানের প্রথাটি সান্তাল সংস্কৃতিতে অঙ্গীভূত হয়েছে।
  • সামাজিক স্বীকৃতি বা চিহ্ন: কালচার বা সংস্কৃতির দিক থেকে সিন্দ্রাদান হলো একটি 'Rite of Passage' বা উত্তরণের আচার। সিঁদুর পরানোর মাধ্যমে সমাজকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে, ওই নারী ও পুরুষ এখন থেকে স্বামী-স্ত্রী। এটি নারীর সামাজিক পরিচয়ের একটি দৃশ্যমান প্রতীক (Visual symbol of marital status)।
  • রঙের প্রতীকী অর্থ: লাল রঙ আদিবাসী সংস্কৃতিতে উর্বরতা (Fertility), নবজীবন এবং শক্তির প্রতীক। তাই সিঁদুর কেবল একটি প্রসাধন নয়, এটি ভবিষ্যৎ বংশবৃদ্ধির একটি সাংস্কৃতিক আশীর্বাদস্বরূপ।

২. সিন্দ্রাদান প্রথার ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রেক্ষিত (Religious Perspective)


যদিও বাহ্যিকভাবে সিন্দ্রাদানকে অন্য সংস্কৃতির প্রভাব মনে হতে পারে, কিন্তু সান্তালরা তাদের নিজস্ব ধর্মতত্ত্বে (সারনা ধর্ম বা Sari Dharam) একে গভীরভাবে আত্মস্থ করেছে। সান্তাল সমাজে এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস।

  • বোঙ্গা বা পিতৃপুরুষের আত্মার সাথে সংযোগ: সান্তাল ধর্মের মূল ভিত্তি হলো 'বোঙ্গা' (Bonga) বা দেবতা ও পিতৃপুরুষের আত্মার উপাসনা। একজন সান্তাল মেয়ে অবিবাহিত অবস্থায় তার বাবার বাড়ির বোঙ্গা বা পূর্বপুরুষদের ছত্রছায়ায় থাকে।
  • আধ্যাত্মিক স্থানান্তর (Spiritual Transition): সিন্দ্রাদানের ঠিক যে মুহূর্তে বর কনের সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেয়, সান্তাল বিশ্বাস অনুযায়ী ঠিক সেই মুহূর্তেই কনে তার পিতৃগৃহের 'বোঙ্গা' থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বামীর পরিবারের 'বোঙ্গা' বা আত্মিক জগতে প্রবেশ করে। সিঁদুর হলো সেই আধ্যাত্মিক চুক্তির সিলমোহর।
  • ধর্মীয় অধিকার লাভ: সিন্দ্রাদান সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত একজন সান্তাল নারী তার স্বামীর বাড়ির কোনো ধর্মীয় বা পারলৌকিক কাজে (যেমন— বোঙ্গা উপাসনা বা পুজোয়) অংশগ্রহণ করতে পারেন না। সিঁদুরদানের পরই তিনি স্বামীর বাড়ির ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পূর্ণ অধিকার লাভ করেন। সুতরাং, এটি সরাসরি তাদের ধর্মচর্চার সাথে যুক্ত।

৩. বিবাহ মণ্ডপের আচার এবং সিন্দ্রাদানের স্বকীয়তা


ছবিতে যেমন দেখা যাচ্ছে, সান্তালদের সিঁদুরদান মূলধারার হিন্দু রীতির মতো নয়। এখানে কনেকে 'দাউরা' (বাঁশের তৈরি বিশেষ ডালা)-তে বসিয়ে শূন্যে তোলা হয় এবং বরকে অন্য একজন কাঁধে বা কোলে তুলে নেয়। এরপর বর কনের মাথায় কাপড় দিয়ে ঢেকে, কোনো পাতা (সাধারণত আমপাতা বা শালপাতা) বা কয়েন ব্যবহার করে সিঁদুর লেপে দেন। এই যে প্রকৃতির উপাদানের (পাতা, বাঁশ) ব্যবহার এবং মাটিতে পা না ছুঁইয়ে শূন্যে সিঁদুর পরানোর রীতি— এটি সান্তালদের নিজস্ব উদ্ভাবন এবং তাদের প্রকৃতি-কেন্দ্রিক আধ্যাত্মিকতার (Nature worship) অনন্য নিদর্শন।

উপসংহার: ধর্ম নাকি সংস্কৃতি?

সান্তাল সমাজের মতো আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোতে 'ধর্ম' (Religion) এবং 'সংস্কৃতি' (Culture)-কে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। তাদের ধর্ম কোনো লিখিত ধর্মগ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং জীবনযাত্রা, উৎসব ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই তাদের ধর্ম পালিত হয়।

তাই বলা যায়, সান্তাল বিয়ের ‘সিন্দ্রাদান’ প্রথাটি একই সাথে ধর্মীয় এবং সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর উৎস বা বাহ্যিক রূপটি পার্শ্ববর্তী সংস্কৃতির প্রভাবে গড়ে উঠলেও (Cultural adaptation), সান্তালরা এটিকে তাদের 'বোঙ্গা' বা আধ্যাত্মিক জগতের সাথে যুক্ত করে একটি গভীর ধর্মীয় পবিত্রতা (Religious sanctity) দান করেছে। এটি কেবল বিবাহিতা নারীর সাংস্কৃতিক চিহ্ন নয়, বরং এক পরিবার থেকে অন্য পরিবারের আত্মিক ও ধর্মীয় জগতে নারীর প্রবেশের চূড়ান্ত ছাড়পত্র।

সান্তাল বিয়েতে ‘সিন্দ্রাদান’: নিশির কাজল সরেন ও জুই মূর্মূ-এর বিবাহ এবং একটি নতুন সামাজিক দিশা

সাম্প্রতিক সময়ে সান্তাল সমাজের নবীন প্রজন্ম নিজেদের শেকড় এবং আত্মপরিচয় নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে সদ্য বিবাহিত দম্পতি নিশির কাজল সরেন এবং জুই মূর্মূ-কে জানাই নতুন জীবনের অনন্ত শুভেচ্ছা ও শুভকামনা। তাদের এই আনন্দঘন বিয়ের মুহূর্তটিকে ঘিরে একটি অত্যন্ত প্রগতিশীল ও যুগোপযোগী চিন্তার উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক— নিশির ও জুইয়ের এই মিলনকে যদি কোনো নির্দিষ্ট "ধর্মের ট্যাগ" বা ধর্মীয় মোড়কে আবদ্ধ না করে, কেবলই "সান্তাল সমাজ বা সংস্কৃতির ট্যাগ" দেওয়া হতো, তবে নিশ্চয়ই মন্দ কোনো কিছু হতো না; বরং এর মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজ এক নতুন দিশা পেতো।

৪. ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে সংস্কৃতির ঐক্য

 বর্তমান যুগে আদিবাসী সমাজগুলো যখন নানাবিধ মূলধারার ধর্মের প্রভাবে (যেমন— হিন্দু, খ্রিস্টান বা অন্যান্য) খণ্ডিত হওয়ার ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তখন 'ধর্ম'-এর চেয়ে 'সংস্কৃতি'-কে বড় করে দেখাই হতে পারে আত্মরক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। নিশির কাজল সরেন এবং জুই মূর্মূর বিয়েতে যে সিন্দ্রাদান প্রথা পালিত হয়েছে, তাকে যদি আমরা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে যাই, তবে তা হয়তো বিতর্কের জন্ম দিতে পারে যে এটি আদি সান্তালি ধর্ম নাকি হিন্দু ধর্মের প্রভাব। কিন্তু একে যদি নির্ভেজাল "সান্তাল সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ" হিসেবে ট্যাগ দেওয়া হয়, তবে সব ধরনের বিভেদ মুছে যায়। সান্তাল সংস্কৃতি তার নিজস্ব বাঁশের দউরা, শাল পাতা আর মাদলের ছন্দে সব ধর্মের, সব মতের সান্তালকে এক সুতোয় গাঁথতে সক্ষম।

৫. নতুন দিশা: শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা

 ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দিলে সমাজ যে নতুন দিশাটি পেতো, তা হলো— "শেকড়ের প্রতি অকৃত্রিম দায়বদ্ধতা"। একটি সমাজ তখনই প্রগতির পথে হাঁটে, যখন তারা তাদের আদিম রীতিনীতিগুলোকে আধুনিক মনন দিয়ে গ্রহণ করতে শেখে। নিশির ও জুইয়ের মতো শিক্ষিত ও আধুনিক তরুণ-তরুণীরা যখন নিজেদের বিয়ের দিন পশ্চিমা বা ভিন্ন কোনো চাকচিক্যের আশ্রয় না নিয়ে, নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও রীতিতে সিন্দ্রাদান সম্পন্ন করেন, তখন তারা মূলত একটি নীরব সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটান। এই বিপ্লবে কোনো নির্দিষ্ট দেবতার নাম থাকে না, থাকে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া জীবনবোধের প্রতি শ্রদ্ধা।

৬. আত্মপরিচয়ের সংকটে সংস্কৃতির ঢাল

 আজকের বিশ্বায়নের যুগে নিজস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা আদিবাসীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের তকমা তাদের সেভাবে সাহায্য করতে পারবে না, যেভাবে তাদের সমৃদ্ধ 'কালচার' বা সংস্কৃতি পারবে। নিশির ও জুইয়ের এই বিয়ে সমাজের অন্য তরুণদের এই বার্তাই দিতে পারে যে— "আমাদের আচার-অনুষ্ঠান কোনো ধার করা ধর্মের অংশ নয়, এটি আমাদের একান্তই নিজস্ব সমাজ-ব্যবস্থার গর্বিত সম্পদ।" এই বোধ যখন সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়বে, তখন সান্তাল সমাজ আর হীনমন্যতায় ভুগবে না, বরং নিজেদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা নিয়ে বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।

পরিশেষে, নিশির কাজল সরেন এবং জুই মূর্মূ-এর নতুন জীবন সান্তাল সমাজের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠুক। তাদের এই বন্ধন কেবল দুটি মানুষের বা দুটি পরিবারের মিলন নয়, বরং এটি সান্তালি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য উদযাপন হয়ে থাকুক। ধর্মীয় ট্যাগের বেড়াজাল ছিন্ন করে, নিখাদ 'সান্তাল সংস্কৃতির' পতাকাবাহী হিসেবে তারা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তা আগামী প্রজন্মকে নিজেদের শেকড় চিনতে এবং এক ঐক্যবদ্ধ, প্রগতিশীল সমাজ গড়তে নতুন পথের দিশা দেখাবে।

বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬

১২:৫০:০০ AM

অসমাপ্ত গল্পের নাম দুলাল টুডু

মাঝরাত পেরিয়েছে অনেকক্ষণ। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত তিনটে। ৭/৩ মনিপুরিপাড়ার চারপাশের কোলাহল যেন কোনো এক জাদুমন্ত্রে থেমে গেছে, শুধু নিস্তব্ধতা আর স্মৃতির ফিসফিসানি। এমন এক মোহময় রাতে হঠাৎ নীরবতা ভেঙে ভারী অথচ ভীষণ স্নেহমাখা একটি কণ্ঠ, ‘বাবু, তোমার কি ঘুম পাচ্ছে?’

আমি যেন এক ঘোরের ভেতর থেকে উত্তর দিলাম, ‘না কাকু, আপনি বলেন। আমার বাবা তো কোনোদিন আমাকে এভাবে বলেনি। আপনার মুখ থেকে এই কথাগুলো শুনতে আমার অনেক ভালো লাগছে।’

তিনি আমার কথায় বাধা দিয়ে একরাশ পিতৃস্নেহ নিয়ে বললেন, ‘না না, কালকে তোমার কাজ আছে, ক্লাস আছে। আজ থাক, কালকে আবার বলবো। আমিও ঘুমাতে যাই।’

এই মানুষটি ছিলেন দুলাল টুডুর বাবা। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের সেই রাতটি স্মৃতির আকাশ থেকে হয়তো অনেকখানিই মুছে গেছে, কালস্রোতে ভেসে গেছে অনেক কিছুই। কিন্তু দুলালের বাবার আমাকে নিজের সন্তানের মতো আপন করে নেওয়ার সেই মুহূর্তটি আজও আমাকে টগবগে এক স্মৃতির আঙিনায় দাঁড় করিয়ে দেয়। আমার ধূসর স্মৃতির জমিনে এক অদ্ভুত মায়ার প্রথম বীজ বুনেছিল এই পরিবারটি, আর সেই বীজের চারাগাছটি ছিল আমার বন্ধু, আমার ভাই—দুলাল টুডু

আমাদের দুই পরিবারের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। আমার বাবা এবং দুলালের বাবা ছিলেন হরিহর আত্মা—প্রাণের বন্ধু। দিনাজপুরের সেন্ট ফিলিপস স্কুল থেকে তারা একসঙ্গে এসএসসি পাশ করেন। দুজনেই ছিলেন তুখোড় ফুটবল খেলোয়াড়। একসময় ফুটবলের নেশায় দিনের পর দিন দিনাজপুরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন তারা। খেলার মাঠের ধুলো আর ঘামের সাথে মিশে তাদের বন্ধুত্বের শেকড় আরও মজবুত হয়েছিল। আমার বাবা ছিলেন অখ্রিষ্টান, আর দুলালের বাবা খ্রিষ্টান। কিন্তু ধর্মের এই ভিন্নতা তাদের আত্মার মিলনে কোনোদিন এক বিন্দু দেয়াল তুলতে পারেনি

১৯৯৩ সাল। ডেনিস মারান্ডির পরম আশ্রয় আর প্রশ্রয়ে আমার ঢাকা শহরে প্রথম পদচারণা। যেহেতু ডেনিস দাদার সাথে আমার আগে থেকেই হৃদ্যতা ছিল, ঢাকা শহরের অচেনা ভিড়ে তিনিই ছিলেন আমার প্রথম ভরসা। এরপর আমরা যখন ৭/৩ মনিপুরিপাড়ায় থাকতাম, তখন তারুণ্যের দীপ্তি নিয়ে দুলাল নটরডেম কলেজে ভর্তি হতে ঢাকায় আসে। সে আমাদের ওখানেই ওঠে

আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে সেই দিনটির কথা। যেদিন সে এল, আমাকে সে 'হেঁদা দাদা' বলে ডাকল। ডাকার আগে তার সেই ভুবন ভোলানো একগাল মুচকি হাসি। সান্তালি ভাষায় সে  বলল, ‘তুমি তো আমার বাবার বন্ধুর ছেলে। তুমি তো আমার আপনজন।’

ঢাকায় বসে সেই প্রথম আমি আবিষ্কার করলাম আমাদের দুই বাবার ফেলে আসা বন্ধুত্বের এক নতুন অধ্যায়। এর আগে বেনিদুয়ারে তার সাথে দেখা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এমন করে হৃদয়ের টান অনুভব করিনি। সে সবসময় আমার সাথে সান্তালি ভাষায় কথা বলত, বাংলায় কথা হতো খুব কম। নিজস্ব ভাষায় কথা বলার সেই মুহূর্তগুলো আমাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল

সে নটরডেম কলেজে ভর্তি হলো। আমরা একসঙ্গে থাকি। আমি তখন সাসু (SASU)-এর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মিটিং-মিছিল, দৌড়ঝাঁপ করি। অবাক করার বিষয় হলো, পড়াশোনার পাহাড়সম চাপ থাকার পরও দুলাল আমাদের প্রতিটি কার্যক্রমে ছায়ার মতো লেগে থাকত। আমি তখন নতুন করে এক দুলালকে চিনতে শুরু করলাম। আমি দেখলাম, ছেলেটার বুকে সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কী তীব্র এক ভালোবাসা! চারপাশে যখন মানুষ নিজের স্বার্থ নিয়ে অন্ধ, তখন দুলাল ছিল এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। সে নির্মোহভাবে, নিঃস্বার্থভাবে অন্যের জন্য কাজ করতে ভালোবাসতো

সাসু’র প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের মধ্যে আমি ছিলাম শেষ সভাপতি, আর দুলাল ছিল আমার কমিটির সাধারণ সম্পাদক। আমাদের পর সাসু’র দায়িত্বভার চলে যায় দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে। দুলাল পরবর্তীতে সভাপতিও হয়েছিল। তার হাত ধরে সাসু অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল

এরপর সময়ের নিয়মে দুলালের বিয়ে হলো। আমারব্যস্ততায় আমাদের মাঝে দূরত্বের একটা পর্দা নেমে আসে। খুব ঘনিষ্ঠভাবে আর যোগাযোগ হয়ে ওঠেনি দীর্ঘদিন। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে একবার খুব অল্প সময়ের জন্য দেখা হয়েছিল

এরপর গত বছরের (২০২৫) ডিসেম্বর মাস। বাংলাদেশের সান্তাল যুবক-যুবতীদের নিয়ে একটি বৃহৎ সংগঠন গড়ে তোলার স্বপ্নে আমরা বটমলি টেকনিক্যাল স্কুলে বসেছিলাম। বছরখানেক আগেই আমি তার অসুস্থতার কথা শুনেছিলাম। সেদিন তাকে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। জিজ্ঞেস করলাম, "এখন কেমন আছিস?" সে হাসিমুখে বলল, "চিকিৎসা নিচ্ছি, এখন ভালোই মনে হচ্ছে।"

নতুন সংগঠনের নামকরণের প্রস্তাবনার জন্য আমি তাকে অনুরোধ করি। সে অসুস্থ শরীর নিয়েও অনেক কিছু লিখে পাঠায়। আমার আর তার প্রস্তাবনাগুলো সে নিখুঁতভাবে কম্পাইল করে দেয়। কথা ছিল, এই বছরের (২০২৬) ২১শে ফেব্রুয়ারির দিকে আমরা আবার বসব। স্বপ্ন বুনব নতুন করে

কিন্তু নিয়তির খেলা বড় নিষ্ঠুর। কথা রাখা হলো না তার। সেই সময়গুলোতেই সে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়। সেখানে টানা ১৪ দিনের মতো ছিল সে। আমি প্রতিদিন ছুটে যেতাম। এক অদ্ভুত মায়া আমাকে টেনে নিয়ে যেত ওর কাছে। একদিন ওর বিছানার পাশে দাঁড়ালাম। দুলাল আমার দিকে তাকাল। ওর ক্লান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আমি দেখলাম সেখানে জল চিকচিক করছে। সেই জল মুহূর্তেই সংক্রামিত হলো আমার চোখেও। আমি নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছিল না। শুধু কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছিলাম, “সাহস রাখো দুলাল। ডাক্তারদের পরামর্শ শোনো। বউয়ের সাথে কথা বলে সব সিদ্ধান্ত নিও।”

কথাগুলো বলার পর আমার গলা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে এল। আমি আর দাঁড়াতে পারছিলাম না। পাশের ডিউটিরত নার্স কে গিয়ে করুণ স্বরে অনুরোধ করলাম, "সিস্টার, প্লিজ আমাকে একটা ছবি তুলতে দেন না। স্মৃতিটুকু অন্তত ধরে রাখি।" নার্সকে বারবার অনুরোধ করার পরও তিনি নিয়মের কারণে বারণ করলেন

আমি কেন সেই দিনগুলোতে বারবার ওর কাছে ছুটে গিয়েছি, আজ ওর চলে যাওয়ার পর তা অক্ষরে অক্ষরে বুঝতে পারছি। অবচেতন মন হয়তো বুঝে গিয়েছিল, ছেলেটা আর বেশিদিন আমাদের মাঝে নেই। সেই কটা দিন আমি রাতে দু’চোখের পাতা এক করতে পারিনি। ঘুমাতে গেলেই বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠত ওর ফুটফুটে ছোট মেয়েটির মুখ। দুলাল ওর বাবার একমাত্র ছেলে। বাবা নেই, মা নেই—একদম কাছের বলতে ওর কেউ ছিল না। কেন এমন হলো? যে মানুষটার বুকে সবার জন্য এত প্রেম, এত ভালোবাসা—তার কেন এমন অকাল বিদায়? মানুষ তো বাঁচতে চায়! বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকার পরও কেন কোষগুলো হঠাৎ করে থেমে যায়?

দীর্ঘ ৩-৪ বছর মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে এক অসম যুদ্ধ শেষে গত ১০ মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:৫০ মিনিটে ঢাকা আল মানার হাসপাতালে দুলাল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৭ বছর। এই অকালে
সে তার স্ত্রী এবং আদরের কন্যা সন্তানটিকে রেখে এক অজানা গন্তব্যে পাড়ি জমালো

দুলাল টুডু কোনো সাধারণ ছেলে ছিল না। সে ছিল অসম্ভব মেধাবী। এসএসসি-তে স্টার মার্কস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ, এবং মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করা এক রত্ন। এরপর সে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয় নটরডেম কলেজের মতো শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে

এমন একজন উজ্জ্বল, পরোপকারী এবং মেধাবী সান্তাল তরুণকে অকালে হারিয়ে সান্তাল সমাজ আজ যে শূন্যতার মুখোমুখি হলো, তা হয়তো কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। দুলাল হয়তো আর কোনোদিন সান্তালি ভাষায় আমাকে 'দাদা' বলে ডাকবে না, কিন্তু আমার বাবার বন্ধুত্বের যে প্রদীপ সে জ্বেলে দিয়ে গেল, তা আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় জ্বলবে চিরকাল

একটা নতুন পৃথিবীতে আবার দেখা হবে।

About

Ghonokuasha Baskey is a Santal writer of Bangladesh. He has started writing since 1985.